কয়লাবৃত্তান্ত

কয়লা – যা “Black Diamond” নামেও পরিচিত। এই যে পৃথিবীতে কয়লা, কয়লার খনি থেকে আহরণ, এর ব্যবহার এবং কয়লা নিয়ে যে এত তন্ত্রমন্ত্র, কিন্তু কয়লা কি আসলে? কোথা থেকে আসে আমাদের ভূগভীরে পাওয়া কয়লা? কিভাবে এর উৎপত্তি?

কয়লা,তেল এবং গ্যাস হচ্ছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি। কয়লা হচ্ছে মূলত কার্বন এর একটি রূপ।ভূতাত্তিক ভাষায় কয়লা হচ্ছে জৈবিক পাললিক শিলা।

“Coal is an organic sedimentary rock that forms from the accumulation and preservation of plant materials, usually in a swamp environment. ” -Hobart M. King

কয়লার রাসায়নিক গঠনের মূল উপাদান হচ্ছে কার্বন,সালফার, নাইট্রোজেন, হাইড্রোজেন, অক্সিজেন। কয়লার ক্যালোরিফিক ভ্যালু দিয়ে এর মান নির্ণয় করা হয় আর ক্যালোরিফিক ভ্যালু বেশি হয় যদি কয়লাতে সবচেয়ে বেশি (৯০-৯৫%) কার্বন থাকে এবং উদ্বায়ী বস্তু কম থাকে।

এখন আসি কয়লার উৎপত্তির ইতিহাসে। আজ থেকে প্রায় ৩০০ মিলিয়ন বছর আগে Permian যুগে।উদ্ভিদ ব্যাকটেরিয়ার প্রভাবে পচে  পিট তৈরি করে সাধারণত জলাশয়ে। যখন কোন উদ্ভিদ মারা যায় এবং তলদেশে পড়ে যায়, তলদেশের পানি এটিকে ক্ষয় থেকে রক্ষা করে। জলাশয়ে সাধারণত অক্সিজেনের অভাব হয়, যা উদ্ভিদ ধ্বংসাবশেষ সঙ্গে প্রতিক্রিয়া করে এবং এটি ক্ষয় করে। অক্সিজেন এই অভাব উদ্ভিদ ধ্বংসাবশেষ অব্যাহত রাখতে পারবেনা। এভাবে তৈরি হয় পিট। পিট কী? পিট হচ্ছে আংশিকভাবে কার্বনযুক্ত উদ্ভিদ ধ্বংসাবশেষ ,যা এখনও পুরোপুরি শক্ত কয়লায় পরিণত হয়নি। এই উপাদান কয়লা হয়ে উঠার পথে চলছে, কিন্তু তার উদ্ভিদ ধ্বংসাবশেষ উৎস এখনও সহজে নির্ণয়যোগ্য।বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকায় উল্লেখযোগ্য পরিমাণ পিট মজুতের সন্ধান পাওয়া গেছে। এগুলোর মধ্যে মাদারীপুরের বাঘিয়া ও চান্দা বিল, খুলনা জেলার কোলা মৌজা, মৌলভীবাজার জেলার মৌলভীবাজার ও চাতাল বিল এবং সুনামগঞ্জ জেলার পাগলা ও চোরকাই প্রভৃতি জায়গায়।

তখন সেগুলো আস্তে আস্তে ভূগর্ভের দিকে নামতে শুরু করে। যতই ভূগর্ভে নিচের দিকে যাওয়া যায় ততই তাপমাত্রা এবং চাপ বাড়তে থাকে। তীব্র চাপ এবং পর্যাপ্ত তাপে পিট পুড়ে তৈরী করে শক্ত কয়লা যেমন লিগনাইট, বিটুমিনাস এবং অ্যানথ্রাসাইট। পিট থেকে কয়লা তৈরীর এ প্রক্রিয়াকে বলা হয় কোলিফিকেশন (Coalification) প্রক্রিয়া।

কয়লার র‍্যাংকিং এ সবচেয়ে এগিয়ে অ্যানথ্রাসাইট কারণ এটি একদম কুচকুচে কালো রঙ, আলো পড়লে ধাতুর মত চকচক করে,ভঙ্গুর, ছোট নীলাভ শিখাসহ জ্বলে এবং সালফারের পরিমাণ নেই বললেই চলে।

এরপর আসে বিটুমিনাস কয়লা। এই কয়লাও গাঢ় কালো বর্ণের, জ্বলে ধোয়াটে হলুদ শিখাসহ। এতে আর্দ্রতা খুবই কম, উদ্বায়ী বস্তুর পরিমাণ সহনীয় এবং কার্বনের পরিমাণও বেশিই। বাংলাদেশের প্রায় সব কয়লাই বিটুমিনাস জাতীয়। এই বিটুমিনাস কয়লা পাওয়া গেছে বড়পুকুরিয়া, দিঘীপাড়া, খালাশপীড়,জামালগঞ্জ, ফুলবাড়ি ইত্যাদি কিছু জায়গায়। এর মধ্যে বড়পুকুরিয়া থেকে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে বাণিজ্যিকভাবে কয়লা উৎপাদন হচ্ছে।

লিগনাইট কিন্তু “Brown Coal” নামেও পরিচিত কারণ এটি পুরোপুরি কালো নয়। এটি অনেকটা স্বতঃস্ফূর্তভাবে পুড়ে যায় যা অবশ্যি আকাংখিত নয়।

কিন্তু আমরা কি জানি কয়লার গুণাগুণ কী?

কয়লা অনেক ভালো জ্বালানি হিসেবে কাজ করে। কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন হয় অনেক জায়গায় যেখানে কয়লার তাপধারণ ধর্ম কাজে লাগানো হয়।আবার স্টিল উৎপাদনে এক ধরনের কয়লা ব্যবহৃত হয় যাকে আমরা বলি “Coking Coal”। এছাড়াও কয়লা থেকে পাওয়া যায় কার্বন ফাইবার, এক্টিভেটেড চারকোল ইত্যাদি। আবার একেক ধরনের কয়লা কিন্তু একেক কাজের জন্য ব্যবহৃত হয়।

কয়লা উৎপাদনের দিক থেকে সবচেয়ে এগিয়ে চীন এবং দ্বিতীয় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। উৎপাদনের পাশাপাশি চীন সবচেয়ে বেশি কয়লা ব্যবহার করে, এবং ব্যবহারের দিক থেকে দ্বিতীয় আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত।

বাংলাদেশের কয়লার আনুমানিক রিজার্ভ ২২৫০ মিলিয়ন টন (বড়পুকুরিয়া, দিঘীপাড়া, খালাশপীড়, ফুলবাড়ি) ১১৮ -৫০০ মিটার গভীরে। বড়পুকুরিয়াতে আন্ডারগ্রাউন্ড মাইনিং পদ্ধতি ব্যবহার হওয়ায় মাত্র ৪০-৪২% কয়লা উদ্ধার করা সম্ভব হয়। ওপেন পিট মাইনিং প্রস্তাবিত হলেও পরিবেশ বিপর্যয়ের কথা চিন্তা করে আন্ডারগ্রাউন্ড মাইনিংই গ্রহণযোগ্য হয়। এছাড়া জামালগঞ্জে আনুমানিক ১০৫০ মিলিয়ন টন কয়লা রয়েছে কিন্তু এটি বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদনযোগ্য নয়। কারণ এই কয়লার স্তর (Coal Seam) এর গভীরতা অনেক বেশি। কিন্তু আশা করা যাচ্ছে যে বড়পুকুরিয়া বাদেও বাকি ৩টি জায়গা থেকে বাণ্যিজিকভাবে কয়লা উৎপাদন সম্ভব হবে শীঘ্রই।

মৃদুলা মামুন বৃষ্টি

৪র্থ বর্ষ, ভূতত্ত্ব বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *