ভূতত্ত্বঃ পর্ব- ০১: “সুপারকন্টিনেন্টের উপাখ্যান”

আমাদের পৃথিবীর জন্ম আজ থেকে প্রায় ৪.৬ বিলিয়ন বছর পূর্বে ৷ পৃথিবী যেমন সূর্যকে কেন্দ্র করে সর্বদা গতিশীল, পৃথিবী পৃষ্ট এবং এর অভ্যন্তরও ঠিক তেমনই গতিশীল ৷ স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন আসে , বর্তমানে পৃথিবীতে যে সাতটি মহাদেশের অবস্থান এবং পরিচিতি ; পৃথিবীর জন্মলগ্ন থেকেই কি তার অবস্থান তেমনই ছিল ? নিশ্চয়ই নয় ! সেই প্রিক্যাম্ব্রিয়ান সময়কাল (৪৬০০ মিলিয়ন বছর পূর্বে) থেকে শুরু করে পৃথিবীর মানচিত্রটি ক্রমশ পরিবর্তিত হয়েছে এবং হচ্ছে ৷ ভূপৃষ্ঠের নানাবিধ বৈচিত্র্যের পেছনে কেটে গেছে লক্ষ লক্ষ বছর ৷ 

জার্মান বিজ্ঞানী এবং আবহাওয়াবিদ আলফ্রেড ওয়েগেনার ১৯১২ সালে সর্বপ্রথম ধারণা দেন যে, সবগুলো মহাদেশ পূর্বে একত্রে যুক্ত হয়ে একটিমাত্র বিশাল মহাদেশ ছিল যার নাম দিয়েছিলেন প্যাঞ্জিয়া (Pangea) .

alfred wegener

Pangea শব্দটির উৎপত্তি প্রাচীন গ্রীক শব্দ “Pan” (অর্থ : সমগ্র) এবং “Gaia” (অর্থ : ভূমি) থেকে ৷ প্যাঞ্জিয়া কনসেপ্টটির উদ্ভাবক আলফ্রেড ওয়েগেনার ১৯১৫ সালে তাঁর বই ” The Origin of Continents and Oceans” এ তাঁর এই হাইপোথিসিস সম্পর্কে বিশদভাবে বর্ণনা করেন এবং উল্লেখ করেন যে , মহাদেশগুলোর ভাঙন এবং বর্তমান অবস্থানে উপনীত হবার আগে সেগুলো একটি একক সুপারকন্টিনেন্ট হিসেবে ছিল যাকে তিনি বলতেন ‘Urkontinent’ ৷ এই সুপারকন্টিনেন্ট প্যাঞ্জিয়া পৃথিবীর প্রায় এক-তৃতীয়াংশ জুড়ে বিস্তৃত ছিল এবং এর চারপাশ ঘিরে ছিল একটি মহাসাগর যার নাম ‘Panthalassa’ ৷ সুপারকন্টিনেন্ট প্যাঞ্জিয়ার ভাঙন শুরু হয় আজ থেকে প্রায ২০০ মিলিয়ন বছর পূর্বে ৷ প্যাঞ্জিয়া ভেঙে এর দু’টি অংশ একে অপরের থেকে দূরে সরে যেতে থাকে এবং তৈরি হয় গন্ডোয়ানা (Gondwana) যা বর্তমান সময়ের দক্ষিণ আমেরিকা ,আফ্রিকা,আরব,মাদাগাস্কার,ভারত,অস্ট্রেলিয়া এবং অ্যান্টার্কটিকা নিয়ে গঠিত আর আরেকটি অংশ লরেশিয়া (Laurasia) যা বর্তমান সময়ের উত্তর আমেরিকা,ইউরোপ এবং এশিয়ার (ভারত ব্যতীত) সমন্বয়ে গঠিত ৷ Laurasia এর অবস্থান ছিল উত্তর গোলার্ধে আর Gondwana বা Gondwana land এর অবস্থান ছিল দক্ষিণ গোলার্ধে ৷

এই যে মহাদেশসমূহের ক্রমাগত ভাঙন এবং একে অপরের থেকে দূরে সরে যাওয়া , এই তত্ত্বটিকে ইংরেজিতে বলা হয় “Continental Drift Theory”. সুপারকন্টিনেন্ট গন্ডোয়ানাও ভাঙনের মাধ্যমে দক্ষিণ গোলার্ধের মহাদেশগুলো তৈরি করে ৷ তবে গন্ডোয়ানার বিভাজন ঠিক কীভাবে হয়েছে তা নিয়ে বহু ভূতত্ত্ববিদের (Geologist) মতভেদ রয়েছে ৷ অধিকাংশ তত্ত্বই বলে যে, গন্ডোয়ানা বিভিন্ন অংশে বিভক্ত হয় ,কিন্তু নব্য গবেষণা আমাদের ধারণা দেয় যে , এই বিশাল স্থলভাগ কেবল দু’ভাগেই বিভক্ত হয়েছিল !

লণ্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক Graeme Eagles বলেন যে, তিনি গন্ডোয়ানার বিভিন্ন ভাগে বিভক্ত হবার তত্ত্ব সম্পর্কে অনেকটাই সন্দিহান কারণ সুপারকন্টিনেন্ট (Pangea) ভাঙন সম্পর্কে যা জানা যায় তার সাথে এটা কিছুটা অসঙ্গত ৷ Eagles এও ভেবেছিলেন যে, একই প্রক্রিয়ার দ্বারা কি আদৌ গন্ডোয়ানার ভাঙন সম্পর্কে ব্যাখ্যা দেয়া সম্ভব ?! পূর্বে বিজ্ঞাণীদের ধারণা ছিল যে গন্ডোয়ানা বিভক্তকরণে “হট স্পট” এর ভূমিকা রয়েছে ৷ এই তত্ত্বে জানা যায় যে,হট স্পটের মাধ্যমে উত্তপ্ত পদার্থ উপরিতলে উঠে আসতে চেষ্টা করে এবং একপ্রকার স্ফীতি তৈরি করে যা ভূমির বিভাজন ঘটায় ৷ অবশ্য এই হট স্পট থিওরির সত্যতা তেমন একটা পাওয়া যায়নি ৷ অন্যদিকে Eagles ঠিক যেখানে মহাদেশটি সর্বপ্রথম ভাঙতে শুরু করে সেখানকার উপাত্ত পর্যালোচনা করে নিশ্চিত হন যে, গন্ডোয়ানা পূর্ব ও পশ্চিম প্লেটে ( Eastern and Western Plates) এ বিভক্ত হয় ৷ তার প্রায় ৩০ মিলিয়ন বছর পরে এ দু’টি প্লেট একে অপরের থেকে দূরে সরে যায়, ফলতঃ একটি সুপারকন্টিনেন্ট ভেঙে দু’টি মহাদেশে পরিণত হয় ৷

ঠিক উত্তর গোলার্ধে অবস্থিত লরেশিয়ারও ভাঙন শুরু হয় আজ থেকে প্রায় ২০০ মিলিয়ন বছর পূর্বে ৷ Du Toit তাঁর বই “Our Wandering Continents” এ ব্যাখ্যা করেন যে, লরেশিয়া এবং গন্ডোয়ানা একটি বিশাল জলরাশি দ্বারা পরস্পরের থেকে পৃথক ছিল ৷ এই জলরাশির নাম টেথিস সাগর ( Tethys Sea) ৷

এতক্ষণ Continental Drift Theory নিয়ে তো অনেক বর্ণনা হলো কিন্তু এই থিওরির পক্ষে প্রমাণগুলো কী কী ? আদৌ কি পূর্বে সব মহাদেশ একত্রে ছিল? এত নিশ্চিতরূপে কীভাবে বলা সম্ভব? নিশ্চয়ই এ প্রশ্নগুলো মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছ! আলফ্রেড ওয়েগেনার তাঁর এই তত্ত্বের পক্ষে নানাবিধ প্রমাণ আমাদের সামনে তুলে ধরেন ৷ এর মধ্যে প্রথম আর সবচাইতে সহজ একটি হলো Geological “Fit” Evidence ! Geological “Fit” evidence বলতে বোঝানো হয়েছে বিভিন্ন মহাদেশগুলোর মধ্যে বড় স্কেলের ভূতাত্ত্বিক গঠনের ম্যাচিং বা মিল ! খুব সহজ করে বলতে গেলে আমরা যেভাবে ছোটবেলায় puzzle মেলাতাম ঠিক তেমনই ঘটনা এর বেলায় !! দেখা গেছে যে, স্কটিশ উচ্চভূমি সংলগ্ন উত্তর আমেরিকার অ্যাপালাশিয়ান পর্বতমালার শিলার স্তরসমূহের সাথে দক্ষিণ আফ্রিকার ক্যারু সিস্টেমের শিলার স্তরসমূহের চমৎকার মিল বিদ্যমান ! আবার, দক্ষিণ আমেরিকা এবং আফ্রিকাও যদি তাদের কাছাকাছি এনে চিন্তা করি তাহলে এগুলোও চমৎকারভাবে puzzle মেলানোর মতোই মিলে যায় ! এটি এ-ই নির্দেশ করে যে, মহাদেশসমূহ একদা একসাথে যুক্ত ছিল ৷

আবার, এই তত্ত্বের পক্ষে আরো একটি পাকাপোক্ত প্রমাণ হলো ফসিল বা জীবাশ্ম ৷ বিভিন্ন মহাদেশে ছড়িয়ে থাকা নানাবিধ ফসিলের মাধ্যমে ওয়েগেনার বুঝতে পারেন যে, কন্টিনেন্টগুলো ভাঙন এবং পৃথক হবার পূর্বে একে অপরের সাথে যুক্ত ছিল ৷ কীভাবে ?! দেখা যাক — মেসোসরাস ( Mesosaurus) হলো মিঠাপানির সরীসৃপ (reptile) ৷ অর্থাৎ এগুলোর বসবাস ছিল মিঠাপানি যেমন লেক, নদীতে …যদি আমরা মহাদেশগুলোর পৃথক হবার পূর্বের মানচিত্রটি দেখি তাহলে আমরা দেখতে পারবো যে , Mesosaurus এর অবস্থান আফ্রিকার দক্ষিণাঞ্চলে এবং উত্তর আমেরিকায় ৷ এবার যদি পৃথক পরবর্তী মানচিত্রের দিকে তাকাই ,তাহলে দেখবো উত্তর আমেরিকা আর আফ্রিকা বিশাল আটলান্টিক মহাসাগর দ্বারা বিচ্ছিন্ন !তাহলে এই রেপটাইল যদি লবণাক্ত পানিতে সাঁতরে যেতে না পারে তবে বিভিন্ন মহাদেশে এর ফসিলের বিস্তৃতি কিভাবে সম্ভব ? অর্থাৎ, নিশ্চয়ই একসময় মহাদেশগুলো পরস্পর যুক্ত ছিল ! একইভাবে, Lystrosaurus এবং Cygnognathus হচ্ছে স্থলচর সরীসৃপ ৷ Cygnognathus এর বিস্তৃতি দক্ষিণ আমেরিকা এবং আফ্রিকায়, অপরদিকে Lystrosaurus এর অবস্থান আফ্রিকা ,ভারত এবং অ্যান্টার্কটিকায় ৷ Lystrosaurus এবং Cygnognathus এর বডি অ্যানাটমি অনুসারে তারা সাঁতার কাটতে অক্ষম ৷ অতএব, নিশ্চয়ই তারা বিশাল মহাসমুদ্র পাড়ি দেয়নি ৷ তাদের ফসিলের এই বিবিধ মহাদেশে বিস্তৃতিই প্রমাণ করে একদা মহাদেশগুলো পরস্পর একসাথে ছিল এবং পরবর্তীতে পৃথক হয়েছে ৷ তেমনিভাবে, Glossopteris ফসিল ফার্নের   ক্ষেত্রেও বিষয়টি প্রমাণিত হয় ৷

ওয়েগেনার এ দু’টো প্রমাণের পাশাপাশি মহাদেশের জলবায়ু থেকে নানা তথ্য নেন ৷ ওয়েগেনার তাঁর অভিযানে সকল মহাদেশে Glacier Groove আবিষ্কার করেন ৷ এমন সব মহাদেশেও তিনি এর উপস্থিতি লক্ষ করেন যেখানে বর্তমান সময়ে তুষারপাত সম্পর্কে কল্পনাও করা যায় না ৷এসব মহাদেশগুলোকে একসাথে আনলে দেখা যায় যে Glacier groove সম্পূর্ণরূপে ম্যাচ করে যাচ্ছে ! Continental Drift Theory প্রমাণের জন্যে তিনি শিলার ভৌত ও রাসায়নিক গঠন এবং পর্বতমালা নিয়েও গবেষণা করেন ৷ এখন প্রশ্ন হলো, মহাদেশগুলো একে অপরের থেকে দূরে সরে যাবার বা কাছাকাছি আসার কারণটিই বা কী ? কোন শক্তির প্রভাবে এগুলো ভূপৃষ্ঠের উপর চলাচল করছে ? এই ম্যাকানিজমটা নিয়ে বিস্তারিত জানবো আমরা পরবর্তী সংখ্যায় !

আনিকা নাওয়ার মায়ীশা

২য় বর্ষ, ভূতত্ত্ব বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়