হালের নতুন বিষ্ময়ঃ এপিজেনেটিক্স!!!

এই সুন্দর পৃথিবীতে এই যে জটিল জীবনের ছড়াছড়ি তার মূলে রয়েছে একটি সাধারণ কোষ। এই কোষেরই গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো ডিএনএ। একটি প্রাণীর বেঁচে থাকার জন্য যাবতীয় যত তথ্য দরকার হয় সবকিছু জমা থাকে তার ডিএনএ(DNA) তে। গঠনগতভাবে ডিএনএ সিকোয়েন্স এর পার্থক্যের কারনে সব মানুষের ডিএনএও কিন্তু একই রকম নয়। খুব সামান্য হলেও কিছুটা পার্থক্য থাকেই, যার কারনে একেক মানুষ একেক রকম। তবে একজন নির্দিষ্ট মানুষের শরীরের প্রতিটি কোষের ডিএনএ কিন্তু একই রকম। প্রশ্নটাও চলেই আসে যে, ডিএনএতেই যদি সকল তথ্য জমা থাকে তাহলে কেন মস্তিকের কোষ, লিভারের কোষ কিংবা হাড়ের কোষগুলো সব একই রকম নয়? কেন প্রতিটি টিস্যুই আলাদা ধরনের কোষ দিয়ে গঠিত? সবার ডিএনএতো একই রকম। এমনকি  হোমোজাইগাস যমজ শিশু, যাদের ডিএনএ হুবুহু এক তাদের মাঝেও সময়ের সাথে সাথে কিছু পার্থক্য ধরা পড়ে। এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ বাংলা সিনেমায় দেখা যায়, তারই দৃষ্টান্ত টেনে ধরা যাক, জন্মের সাথে সাথেই যমজ দুইটি শিশুর একটি বড় হল কোন উন্নত পরিবারে আর অপরটি একটি সুবিধাবঞ্চিত পরিবারে । একজন খাচ্ছে উচ্ছিষ্ট  সবজি, ফরমালিন দেয়া মাছ, পানি মেশানো দুধ, কিন্তু অপরজন খাচ্ছে শুধুই অর্গানিক খাবার। একজন শিক্ষার সুজোগই পায়নি,অন্যজন স্বশিক্ষিত। এই অবস্থায় আজ থেকে ১০ বছর পরে দেখা যাবে একজন হয়তো মানুষের পকেট হাইজ্যাক করা যায় সেই ফন্দি আটছে, আর অন্যজন দেশের অর্থনীতি খাতে সাফল্য বয়ে আনছে। দুজনকেই তখন একসাথে করা হলে দেখা যাবে দুজনের মধ্যে মিল নেই বললেই চলে। একজন হয়তো  লম্বা এবং স্বাস্থ্যবান, অন্যজন ভঙ্গুর স্বাস্থ্যের অধিকারী। অর্থাৎ, এমন নয় যে শুধু দেখতে আলাদা, আচরণে ভিন্নতা প্রকৃত পক্ষে দুজনেই সম্পুর্ন আলাদা মানুষ হয়ে গেছেন।

একই জিনোমের কপি উভয়ই প্রতিটি কোষে নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে এতদিন, অথচ কতটা অমিল!! কিন্তু কেন?

সহজেই বোঝা যায়, ডিএনএ ছাড়াও অন্য কোনো উপাদানের কারসাজি এইটা যা এখানে দায়ী যা ডিএনএ কে নিয়ন্ত্রন করে। এই ধারণার সূত্রপাত হয় ২০০৩ সালে পূর্নাংগ মানবজিনোম সিকোয়েন্স প্রকাশিত হবার পর। বিজ্ঞানীরা বুঝতে পারেন ডিএনএই সব কিছু নয়। ডিএনএ কিভাবে কাজ করে বুঝতে হলে প্রথমেই ভা্লো করে বুঝতে হবে ডিএনএ কিভাবে নিয়ন্ত্রিত হয়। এথেকেই তৈরি হয় বিজ্ঞানের নতুন এক শাখার, যার নাম ‘জেনেটিক্সের অতীত’ বা এপিজেনেটিক্স।

 

একই জিন (ডিএনএ এর অংশ, যেখানে নির্দিষ্ট তথ্য জমা থাকে) কিভাবে একেক সময়ে পরিবর্তিত পরিস্থিতে ভিন্ন্য রকম আচরন করে, তা নিয়েই এপিজেনেটিক্স, আর যে ফ্যাক্টরগুলো জিনের আচরনকে নিয়ন্ত্রন করে তাদেরকে বলা হয় এপিজিনোম। এপিজিনোম ডিএনএ কে পরিবর্তন করেনা, কিন্তু এটা নির্দিষ্ট করে কোন কোন জিন জীবদ্দশায় তার বৈশিষ্ট্য প্রকাশ করবে এবং এই বৈশিষ্ট্য কি পরবর্তীতে সন্তানদের মধ্যে এমনকি তাদের নাতি-নাতনীদের মধ্যে উত্তরাধিকার সূত্রে পাবে কিনা।

এই যে বৈশিষ্ট্যগুলো প্রকাশ পাওয়াটা বা না পাওয়াটা, এটা সম্পূর্নই নির্ভর করে এক প্রকার কার্বন যৌগ ‘মিথাইল গ্রুপ এর উপর। উক্ত গ্রুপ  আর ডিএনএর মধ্যের সম্পর্কটা অনেকটাই লিফটে কাজ করা সেন্সরের মত। মিথাইল গ্রুপ জিনের সাথে যুক্ত হয়ে ঐ জিনের বহন করা বৈশিষ্ট্য প্রকাশে বাধা দেয়, ঠিক যেভাবে লিফটে মা্নুষ উঠে গেলে সেন্সর টের পেয়ে লিফটের দরজা বন্ধ করে দেয়। মিথাইল গ্রুপের সাথে সাথে এপিজেনেটিক্স হিস্টোন দিয়ে নিয়ন্ত্রিত হয়। । হিস্টোন এক ধরনের প্রোটিন যার মধ্যে ডিএনএ প্যাচানো অবস্থায় থাকে ঠিক জিলাপির প্যাঁচের মতোই,এই প্যাঁচগুলো ঘন সন্নিবেশিত অথবা হালকাভাবেও সন্নিবেশিত থাকতে পারে। হিস্টোন এর সাথে জড়ানো ডিএনএ ঘন সন্নিবেশিত হলে সেটা নিয়ন্ত্রন করে কম সংখ্যক জিনের বৈশিষ্ট্য প্রকাশ। যদি হালকাভাবে সন্নিবেশিত থাকে, তখন বেশি সংখ্যক জিন তার বৈশিষ্ট্য প্রকাশ করতে পারবে। অর্থাৎ মিথাইল গ্রুপের অনেকটা গাড়িতে চাবি দেওয়ার মতো।  অন্যদিকে হিস্টোন কাজ করে গাড়ির গিয়ারের মত। দেহের প্রতিটা কোষের আলাদা মিথাইলেশন এবং হিস্টোন প্যাটার্ন রয়েছে। যার ফলে এই মিথাইলেশন এবং হিস্টোন প্যাটার্নই একটা পেশীর কোষকে পেশী কোষ, একটা ত্বকের কোষকে ত্বকের কোষ হিসেবে থাকার জন্য প্রয়োজনীয় তথ্য বহন করে।

এপিজেনেটিক প্যাটার্ন পরিবর্তন হয় এবং এরাই কোনো জিনের প্রকাশ ঘটায় , আবার কোনোটার হবেনা। সুতরাং, এপিজেনেটিক তথ্য উপাত্ত স্থায়ী নয়। এটা সারা জীবনই কোন না কোন পরিবর্তনের মধ্যে দিয়ে যায়, বংশগতির মাধ্যমে ছড়ায় এবং কিছু কিছু সময় যেমন বয়ঃসন্ধিকালে অবশ্যই পরিবর্তন হয়। বয়ঃসন্ধিকালে বিশেষ কিছু অংগের কোষে এপিজিনোম পরিবর্তন হয়, যায় ফলে সেখানে চুল গজানো শুরু হয়। কিছু কিছু অংগের কোষের এপিজিনোমে পরিবর্তনের কারনে দেখা যায় হঠাৎ ব্রন গজানো শুরু হয়। আবার একজন গর্ভবতী অবস্থায়, সংশ্লিষ্ট অংগের এপিজিনোম পরিবর্তন হয় এবং একটি ভ্রুনকে পরিচর্যা করে মানবশিশুতে পরিনত করার জন্য প্রয়োজনীয় পরিবেশ সৃষ্ট হয়।

এরকম বিশেষ সময়গুলো ছাড়াও নানান কারনে এপিজেনেটিক তথ্য উপাত্ত পরিবর্তন হয়। আমরা কোন পরিবেশে থাকছি, কি খাচ্ছি, কি গন্ধ নিচ্ছি, প্রতিদিন কিরকম পরিশ্রম করছি এসবের প্রভাবেও এপিজিনোম পরিবর্তন হয়। বিজ্ঞানীরা সাম্প্রতিক কালে বলছেন, বাজে খাদ্যাভ্যাস মিথাইল গ্রুপকে ভূল জিনের সাথে যুক্ত হবার পথে পরিচালিত করে। ফলে কোষ ভূল তথ্য পায়, কোষের কাজ হয়ে পড়ে অস্বাভাবিক সবশেষে দেখা দেয় রোগ এমনকি ক্যান্সার হতে পারে। সাম্প্রতিক কালে শুধু ক্যান্সারই না, বরং ডায়বেটিস, অটোইম্যুন ডিসর্ডার প্রায় মহামারীর মত দেখা যাচ্ছে। এপিজেনেটিক্সের ধারনা ব্যাবহার করে সায়েন্টিস্টরা জানতে পারছেন কিছু কিছু ক্যান্সারের কারন এই এপিজেনেটিক ট্যাগ গুলোর ভূল অবস্থান। তাই তারা এমন ড্রাগ ডিজাইন করছেন যার ফলে খারাপ জিন গুলো আগে থেকেই চুপ করানো, এবং ভূল এপিজেনেটিক ট্যাগ গুলো মেরামত করা সম্ভব হবে। আরও ধারনা করা হচ্ছে আমাদের বাবা-মার থেকে এরকম পাওয়া এপিজেনেটিক তথ্যের কারনেই এমনটা হচ্ছে।

যেদিন সম্পূর্ন এপিজিনোমকে বুঝা সম্ভব হবে সেদিন হয়তো পৃথিবী থেকে ক্যান্সার এর মতো অনেক মরণব্যাধি চিরতরে দূর করতে পারব।বিজ্ঞানীরাও বসে নেই। তারা ইতিমধ্যে এই লক্ষ্যে কাজ শুরু করেছেন। আগামী ১০ বছের্র মাঝে অন্তত ১০০০ এপিজিনোমিক মেকানিজম আবিস্কারের লক্ষ্যে ইত্যিমধেই International Human Epigenome Consortium (IHEC) গঠন করা হয়েছে। এক্সময় এই এপিজেনেটিক্স সম্পর্কিত সব গবেষণা চিকিৎসা বিজ্ঞানে যুগান্তকারী পরিবর্তন আনবে বলে আশা ব্যক্ত করা হচ্ছে।

সারাহ উমায়মা মাহদিয়া

চতুর্থ বর্ষ,জিন প্রকৌশল ও জীবপ্রযুক্তি বিভাগ

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

1 thought on “হালের নতুন বিষ্ময়ঃ এপিজেনেটিক্স!!!

  1. Md RayhanUddin

    আপনার লেখাটি অনেক তথ্য ভিত্তিক। আমারও এপিজেনেটিকস এর প্রতি অনেক আগ্রহ আছে এবং আরো আরও বেশি জানার ইচ্ছা আছে এপিজেনেটিক্স নিয়ে। ধন্যবাদ!

    Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *